আমদানি কর হ্রাসে নিত্যপণ্যের দাম কমবে : এফবিসিসিআই

নিউজ ডেস্ক

নতুনের সাথে আমরা

প্রকাশিত : ০৯:১৮ এএম, ৯ জুন ২০২৪ রোববার

আমদানি কর হ্রাসে নিত্যপণ্যের দাম কমবে : এফবিসিসিআই

আমদানি কর হ্রাসে নিত্যপণ্যের দাম কমবে : এফবিসিসিআই

নিত্যপণ্য ধান গম আলু পেঁয়াজ রসুন মটরশুটি ভোজ্যতেল চিনি ও বাদাম প্রভৃতি পণ্যের ওপর আরোপিত উৎসে কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে- যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে বলে মনে করে এফবিসিসিআই। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের এই শীর্ষ সংগঠন মনে করে, এ ভোগ্যপণ্যের বাজারে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে জরুরি।কারণ দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহের খরচ এখন অনেক বেড়ে গেছে। এফবিসিসিআই মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে, জনগণের চাহিদা ও আকাক্সক্ষা পূরণে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বাজেটের এই আকার বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য। তবে বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দরকার সুশাসন ও যথাযথ মনিটরিং। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে  সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব, দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকির মান বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি। 
শনিবার মতিঝিলের ফেডারেশন ভবনে প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫ নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এ সময় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, ঢাকা চেম্বার সভাপতি আশরাফ আহমেদসহ এফবিসিসিআইর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি মনে করেন, সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন তা অনেক বেশি। এতে করে বেসরকারিখাতের ঋণের প্রবাহ কমে যেতে পারে। চাপে পড়বে বেসরকারি খাত। এ অবস্থায় সরকারের উচিত বিদেশী উৎস থেকে ঋণ করা। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী।

আমরা ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে নিত্যপণ্য আমদানিতে উৎসে কর পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু ১ শতাংশ বা অর্ধেক কমানো হয়েছে। এটাও স্বস্তির। এর ফলে আমদানিকৃত পণ্যের আমদানি খরচ কমবে এবং যার প্রভাব মূল্যস্ফীতির পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতার মুখে পড়বেন। এই যুক্তি দেখিয়ে বাজেটের লক্ষ্য পূরণে সরকারকে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।সেখানে আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। সেই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৭ শতাংশ। এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, এটা যদি ব্যাংক থেকে সরকার নেয়, তাহলে ব্যাংক থেকে আমাদের ব্যবসায়ীদের টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে একটা জটিলতা হতে পারে।

আমাদের লোন পেতে কষ্ট হতে পারে। এ অর্থ যদি বিদেশ থেকে সরকার ঋণ নিতে পারে, আমি মনে করি ভালো হবে। তবে সার্বিকভাবে এই বাজেট ‘বাস্তবসম্মত এবং বাস্তবায়নযোগ্য’ বলে মনে করছে এফবিসিসিআই। মূল্যস্ফীতি কমাতে সামগ্রিক প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়ে মাহবুবুল আলম বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয়। এবারের বাজেটে এটাকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আমি মনে করি, উচ্চাভিলাসী কোনো প্রকল্প না নিলে এবং আমাদের যে প্রকল্পগুলো নেওয়া হচ্ছে, ভালোভাবে যদি সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, আমরা যদি সবাই মিলে চেষ্টা করি, তাহলে এটা (মূল্যস্ফীতি) কমে আসবে বা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, করমুক্ত আয়সীমা যেটা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সেটা এবারও তাই আছে।

আমাদের প্রস্তাব ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার। আমাদের অনুরোধ থাকবে, এটা যেন সেই প্রস্তাব অনুযায়ী রাখা হয়। রপ্তানি বাজার বড় করতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর (এটি) বাদ দেওয়ার যে দুটি প্রস্তাব এফবিসিসিআই দিয়েছিল, সেটি রাখার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এটি এবং এআইটি প্রত্যহারের দুটো প্রস্তাব আমরা করেছিলাম, আমি তা আবারও করছি।

রাজস্ব আদায়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে করজাল বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আপনারা দেখেছেন যে লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আদায় করা কঠিন বলে আমরা মনে করি। তবে কঠিন হবে না, যদি করজাল বাড়ানো যায়। যারা কর দিচ্ছে, তারা ছাড়াও নতুনদের করজালের মধ্যে আনতে হবে।

এছাড়া ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে আওতা বাড়ানো এবং উপজেলা পর্যন্ত কর অফিস বিস্তৃত করা প্রয়োজন। মাহবুবুল আলম বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে অবস্থিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মূলধনী যন্ত্রাংশ ও নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করা হয়েছে। এতে এসব বিশেষ অঞ্চলে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। 
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, কর ফাঁকি বের করতে কর্মকর্তাদের পুরস্কার দেওয়ায় আইনের অপপ্রয়োগ হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতা কমানোর জন্য পুরস্কার প্রথা বাতিল করে বিকল্প প্রণোদনার ব্যবস্থার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

একইসঙ্গে রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এডিআর সিস্টেম কার্যকর করার পাশাপাশি কর ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কর আপিল ট্রাইব্যুনালে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচার বিভাগীয় সদস্যকে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট করার জন্য আমরা আহ্বান জানিয়েছিলাম।

বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্যকে প্রেসিডেন্ট করার বিধান করা হয়েছে। এ প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, যথাযথ বিনিয়োগ ও শিল্পোন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ধারাকে অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। রাজস্ব নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা আস্থার সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে। এজন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সুসমন্বয় রাখা জরুরি বলে মনে করি।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে-এমসিসিআই ॥ মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-ঢাকা (এমসিসিআই) মনে করে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়মিত করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে। তাই এ ধরনের সুযোগ না দেওয়াই ভালো। সম্প্রতি বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এমসিসিআই জানিয়েছে, অপ্রদর্শিত আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হারে কর আরোপসহ জরিমানার বিধান রেখে এই ব্যবস্থা প্রচলন করলে নিয়মিত করদাতারা উৎসাহিত হবে বলে এমসিসিআই বিশ্বাস করে।

গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ৫৩তম জাতীয় বাজেট সংসদে উত্থাপন করায় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এমসিসিআই মনে করে, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়া, মন্থর বিনিয়োগ ব্যবস্থা, ব্যাংক ঋণের জন্য উচ্চ সুদহার, ফিলিস্তিন-ইসরাইল ও রাশিয়া-ইউক্রেন চলমান যুদ্ধ, স্মার্ট বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়ন এবং ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীতকরণের সময় বাজেট প্রস্তুত করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ।

তবে বাজেটকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে বাজেট ব্যবস্থাপনার গতিশীলতা, করনীতি সংস্কার, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর সংগ্রহে সামগ্রিক সিস্টেম লস কমানো এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি তথা জনগণকে যথাযথ সেবা দেওয়া আরও সুযোগ আছে। নিয়মিত কর প্রদানকারী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের ওপর আরও বেশি করের বোঝা চাপানো হচ্ছে উল্লেখ করে বিষয়টি সঠিকভাবে সমাধানের জোর দাবি জানিয়েছে এমসিসিআই।

প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা হলো ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট থেকে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ কম। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার দুই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে-প্রথমত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটি ক্রাউডিং আউট প্রভাব তৈরি করতে পারে, যার ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে, যে চাপ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় ভোক্তা বা জনগণকে। তাই এমসিসিআই এই দুই বিষয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করছে।