ঢাকা, শনিবার   ১৬ অক্টোবর ২০২১ ||  আশ্বিন ৩০ ১৪২৮

দ্রোণাচার্যের ভূমিকায় হাসান আজিজুল হক

প্রশান্ত মৃধা

প্রকাশিত: ১১:৪৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১  

হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হক

অন্তত চার দশক ধরে হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের ছোটোগল্প লেখকদের কাছে দ্রোণাচার্যের ভূমিকায়। ওই ছোটোগল্প লেখক পাণ্ডব-কৌরব হলে একেবারে প্রকাশ্য তাঁর শিষ্যসাবুদ। আর একলব্যের মতন গহিন অরণ্যবাসী হলে—তিনি জানেন না সেই ছাত্রকে। অনুমান করি, এক্ষেত্রে একলব্যের সংখ্যাই বেশি। এই বেশি কোনও অনুমাননির্ভর সংখ্যা নয়, অনুমানের বাইরেও তো একপ্রকার অনুমাননির্ভরতা থাকে, সেভাবে অনুমান করে নেওয়া যায়। সেই হিসেবে হাসান আজিজুল হক হয়তো তাদের শুরুতে জানেন না চেনেন না, দেখা হওয়ার ও জানার সুযোগ ঘটে না, ঘটে না সেইসব একলব্যের সঙ্গে কোনওপ্রকার সংযোগ।

কথাগুলো মহাভারত থেকে একপ্রকার রূপকের আশ্রয়ে হাজির করলাম বটে, কিন্তু এর কিছু বিস্তার নিজের ও নিজেদের কালের। কিছু অগ্রবর্তী সময়ের লেখকদের অনুমান হিসেবে অভিজ্ঞতা ও অভিযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে নেয়া। তাতে অন্তত এই রূপকের অভিপ্রায়ের বাইরে নিজেদের গল্পলেখক তার অভিজ্ঞতার কোনও না কোনও হিসাবও মিলিয়ে দেখা হবে।

ভীম অর্জুন আচার্য দ্রোণের ছাত্র, ছাত্র দুর্যোধন আর দুঃশাসনও। বাইরে থাকে প্রথম পার্থ কর্ণ—অধিরথ সূতপুত্র। একদিন কুরুকুলের রাজকুমারেরা জঙ্গলে গেলে সেখানে তাদের কুকুরকে বাণ মেরে বাকরহিত করে দিলে তারা আবিষ্কার করে একলব্যকে। দ্রোণাচার্যকে রাজপুত্ররা শুধায়, বাণ ছোড়ার এই কৌশল কেন তাদের শেখাননি তিনি! যা জানে ওই ভূমিপুত্র অজ্ঞাতকুলশীল একলব্য। আবিষ্কৃত হয়, একলব্যের কুটিরের সামনে দ্রোণাচার্যের মূর্তি। রাজকুমার সে নয়, তার অস্ত্রগুরু দ্রোণের কাছে অস্ত্রচালন শেখা সম্ভব হয়নি। তাই এই মূর্তি বানিয়ে এভাবে শরচালন শিখেছে সে। এরপর আছে গুরুদক্ষিণার চরম নিষ্ঠুর নিদর্শন।

মহাভারতের কাহিনি মনে রেখে এখন হাসান আজিজুল হককে দ্রোণাচার্য উল্লেখের কারণ এখানেই। পৈতৃক আদি নিবাস তাঁর বর্ধমান, দেশবিভাগের কয়েক বছর পরে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে এসে ভর্তি হয়েছেন খুলনার ব্রজলাল কলেজে, তারপর রাজশাহীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। কাজ করেছেন, অর্থাৎ পড়িয়েছেন এদেশের দক্ষিণ ও উত্তর মিলিয়ে—সিরাজগঞ্জ, খুলনা আর রাজশাহীতে। স্বাধীন বাংলাদেশ আর অখণ্ড বাংলার ভূগোল মিলিয়ে এই জায়গাটুকু যদি মাইল কি কিলোমিটারে আটকে দিতে চাই—তাহলে তা কোনওভাবেই শ তিনেক মাইলের বেশি হবে না। খুলনা রাজশাহী, রাজশাহী খুলনা আর রাজশাহী থেকে পশ্চিম দিকে বর্ধমান—বৃহত্তর বাংলাদেশকে মনে রেখে একটি বাহু বাড়িয়ে দিলে তার পৈতৃক ভিটে আর রাজশাহী থেকে মধ্যবঙ্গ ঢাকা—যেখানে পূর্ব পাকিস্তান কি পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশের একজন লেখকের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা। মোটামুটি এই তাঁর জগৎ।

কিন্তু দ্রোণাচার্যের যে হিসেবেটা নিজের ভিতরে লতিয়ে উঠছে, তা নাড়িয়ে দেখলে দেখা যায়, খুলনা কি রাজশাহীতে কেউ কেউ তাঁকে খুব কাছে পেয়েছেন। ধরে নিতে পারি, মহাভারতের ওই কাহিনির মতো। একেবারে সামনে, আচার্যর সামনে শিষ্যকুল, পাণ্ডব কৌরব। এই পাণ্ডব এই কৌরব সবই বলার জন্যে বলা, রূপকের আশ্রয়। আর এর বাইরে, বাংলাদেশে যারা কাছ থেকে তাঁকে দেখেননি, সামনে পাননি (সে সুযোগ সাধারণত লেখার শুরুতে ঘটেই না) তারা অন্তত তাঁর লেখা পড়ে, আগের প্রজন্মের লেখকদের কাছে শুনে আর সাহিত্যিক অভিযাত্রী বন্ধুদের মুখ থেকে জানা অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তৈরি করে নিচ্ছেন এক গড়ন—সেই কৌশলটি তখন তাদের কাছে এক একক একলব্যের।

যখন গল্প লিখতে শুরু করেছেন তারা, যখন গল্প লিখবার কৌশলগুলো হাতে তুলে নিতে মশগুল নিজের কাছে—তখন, রাস্তায় মানুষ দেখে, প্রকৃতিতে বৃষ্টি খরা শীত দেখে; গাছের পাতা দেখে, পাতা ঝরাও দেখে। পিতার সঙ্গে কন্যাকে দেখে। খাল খনন হতে দেখে। দাঁড়িপাল্লায় ভাত মাপতে দেখে। হাসপাতাল দেখে। কৃষককে গরু কিনতে যেতে দেখে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছে গাছতলায় মা ও মেয়েকে দেখে। ওই ক্যাম্পাসে পিতা আর কন্যাকেও দেখে। রাষ্ট্রপতিকে দেখে। যুবসমাজ দেখে। যুব উন্নয়ন কমপ্লেক্স দেখে। কত শত দেখা! এর বাইরে এই বাংলায় দেখার তো কোনও শেষ নেই। ওই তরুণ গল্পলেখক এই একটু আগেকার দেখাগুলোর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখে, নিজের দেখার চোখ খুলে, চোখ সামনে এনে, চশমা খুলে বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর নদী জল সব দেখে, শতেক শোষণ আর বঞ্চনা, খেতে না পাওয়া মানুষ আর খেতে পেয়ে পেয়ে বা খেয়ে খেয়ে পেট ফুলে ঢোল মানুষ—আর এক একখানা গল্পে তা লিপিবন্ধ করার নিজস্ব প্রয়াস নেয়। কিন্তু তখনই বাধে গোল।

রবীন্দ্রনাথ হয়ে বিভূতি তারাশঙ্কর মানিক বাড়ুজ্জের গল্পের পৃষ্ঠা ততদিনে কম উলটানো হয়নি। অথবা, একটু উলটো হাঁটার চেষ্টায় জগদীশ গুপ্ত কি প্রেমেন মিত্তির কি কমলকুমার কি ওয়ালীউল্লাহও। আর খুব কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার আরও লেখকের লেখা তো আছেই। কিন্তু নিজেদের সেই নবিশি অভিজ্ঞতা থেকে জানি, অনেকের সামনে তখন দ্রোণাচার্যের মতো শস্ত্রশিক্ষক হয়ে উপস্থিত থেকেছেন হাসান আজিজুল হক।

অল্প বাতাসে কলাপাতার একবার বুক দেখানো পিঠ দেখানো অভিজ্ঞতা শুধু নয়। কিংবা সরল হিংসার খোঁজও নয়, নয় সারা দুপুরের অভিজ্ঞতাও। তখন নিজস্ব চেষ্টায় সেই অক্লান্ত একলব্যের সামনে সাদা পৃষ্ঠা কিন্তু নিজের ভিতরের চেষ্টায় কোথায় যেন এক স্থিরীকৃত দৈর্ঘ্যপ্রস্থের হিসেব—গল্প লিখতে হবে ও রকম। ফলে, বই পড়ে শেখা, বইয়ের গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা আর এর সঙ্গে নিজের চেষ্টা—সব মিলেমিশে গেলেও হাসান আজিজুল হক গাঁট হয়ে সামনে বসে থাকেন, হাতে গুরুর ছড়ি, নিজেরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতন এক একজন একলব্য। একই সঙ্গে শরচালন যেমন শিখছে, ওদিকে কাদামাটি দিয়ে হাসান আজিজুল হকের থেকে দূরে বহু দূরে বসে তাঁর মূর্তি বানিয়ে নিজের চেষ্টাকে দক্ষিণা হিসেবে সমর্পণ করে চলেছে।

উপরের কথাগুলো সমষ্টিতে মিলিয়ে বললেও, নিজের কাছে একেবারে একান্তে তা ই ছিল। তা ই আছে। আত্মজা ও একটি করবী গাছের গল্পগুলো লেখা হয়েছিল একটি এবড়োখেবড়ো সংবাদপত্র লাছা টেবিলে, সেই টেবিল তখন হয়ে যায় যেন নিজের টেবিল। একটি সরু নিবের শেফার্স ঝরনাকলমে হাফ একসারসাইজ খাতায় লিখেছেন শকুন। যেন, নিজের গল্প লিখবার চেষ্টায় সেই খাতার কালো কালো প্যাঁচানো দুষ্পাঠ্য অক্ষর হয়ে ওঠে নিজের লিখবার, লেখা শিখবার কৌশল। আর প্রকাশমাত্র তাঁর এক একটি লেখা পড়ার আকুতি বলে দেয়, এই একলব্যত্ব কোনওভাবে ছেড়ে যাবার নয়।

আচার্য দ্রোণ তো জানতেন না একলব্যের সাকিন, কিন্তু একলব্য জানত গুরুকে। তেমনি হাসান আজিজুল হকও জানেন না, গত চার দশক ধরে আর কতজন একলব্য একটি গল্প লেখার চেষ্টায় কী গভীর নিষ্ঠায় তাকে দ্রোণাচার্য মেনে শরচালন শিখছে। হয়তো, সে শেখা কোনওভাবে হয়ে উঠছে না। হয়তো হবেও না। অথবা, হবে গুরুর চেয়েও নিপুণ। কিন্তু, দূর থেকে শস্ত্রগুরু হিসেবে তাঁকে একটি একটি গল্প লিখবার ভিতর দিয়ে প্রণতি জানাতে কোনও বাঁধা নেই তার।...

সর্বশেষ
জনপ্রিয়