ঢাকা, রোববার   ২৮ মে ২০২৩ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪৩০

স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৮ শতাংশ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:২২, ৩০ মার্চ ২০২৩  

স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৮ শতাংশ

স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৮ শতাংশ

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। চার লেনবিশিষ্ট দেশের প্রথম এই টানেলে যানবাহন চলাচলের অপেক্ষামাত্র। নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশ। আর মাত্র ২ শতাংশ কাজ বাকি। এখন টানেলের ভেতর টেকনিক্যাল নানা বিষয়ের কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হতে মে মাস পর্যন্ত সময় লাগবে। তারপর টানেল গাড়ি চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে। এর পরই এই টানেল উদ্বোধন করা হবে।

তবে গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে টানেলের দক্ষিণ টিউবের নির্মাণকাজের সমাপ্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে বলা হয়েছিল, ২০২৩ সালের জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে টানেলের কাজ শেষ হবে। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে এই সময়ের মধ্যেই টানেল চালু হবে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

টানেলের পুরো কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে- জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, টানেলের ভেতরের দুটি টিউবের সিভিল কাজ শেষ। এখন ইলেকট্রো-মেকানিক্যালসহ টেকনিক্যাল কাজ চলছে। টানেল যেহেতু মাটির নিচে, তাই সেটিকে যানবাহন চালাচলের উপযোগী করা হচ্ছে। বর্তমানে টানেলের ভেতর সাত ধরনের কাজ চলছে। বিভিন্ন মেশিনারিজ টেস্ট করা হচ্ছে। মেকানিক্যাল সিস্টেমের কমিশনিং ও প্রি-কমিশনিং শেষে যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে টানেল। আমাদের টার্গেট, এসব কাজ এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে শেষ হবে। তারপর সরকার সেটির উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত নেবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখন এই প্রকল্পে ইলেকট্রো-মেকানিক্যালের সাত ধরনের সিস্টেম বাসানো হচ্ছে। এর মধ্যে আছে ভেন্টিলেশন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, অগ্নিনির্বাপণ, পানি নিষ্কাশন, ড্রেনেজ-ব্যবস্থা, কমিউনিকেশন ও মনিটরিং সিস্টেম ইনস্টল করার কাজ। সব সিস্টেম বসানোর পর দেখা হবে টানেলের প্রত্যেকটি সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করছে কি না। সেটি দেখার পর কাজ শেষ করার ঘোষণা আসবে। এই কাজগুলো শেষ হলে টানেল গাড়ি চলাচলের উপযোগী হবে।

এদিকে ১১ মিটার ব্যবধানে ৩৫ ফুট চওড়া এবং ১৬ ফুট উঁচু দুটি টিউব নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভারী যানবাহন সহজে টানেল দিয়ে যেতে পারে। নদীর তলের এই মূল পথের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এর বাইরে পতেঙ্গা প্রান্তে ৫৫০ মিটার এবং আনোয়ারা প্রান্তে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই পথের দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। অ্যাপ্রোচ রোডের পাশাপাশি ৭৪০ মিটার সেতু মূল শহর, বন্দর এবং নদীর পশ্চিম দিককে পূর্ব দিকের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানেলটি প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়েকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার কমিয়ে দেবে। তা ছাড়া এই টানেল দিয়ে যানবাহন ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারবে।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যৌথভাবে বঙ্গবন্ধু টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম টানেল টিউব নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের যৌথ অর্থায়নে টানেল প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। চীনের এক্সিম ব্যাংক ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। বাকি অর্থ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। চীনের এক্সিম ব্যাংক ২ শতাংশ হারে সুদে এই ঋণ দিয়েছে।

 

প্রথমে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি হয় ২০১৩ সালে। এরপর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি ২০১৫ সালের নভেম্বরে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মাল্টিলেন রোড টানেল প্রকল্পটি অনুমোদন করে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে খরচ বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা করা হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সংশোধিত বাজেটে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যয় প্রায় ৩১৫ কোটি টাকা বেড়ে খরচ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।

টানেলের ২০১৩ সালের সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানেল চালুর বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারে। সে হিসাবে দিনে চলতে পারে ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি। ২০২৫ সাল নাগাদ টানেল দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলবে। যার মধ্যে অর্ধেক থাকবে পণ্যবাহী যানবাহন। ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ৩৭ হাজার ৯৪৬টি এবং ২০৬৭ সালে ১ লাখ ৬২ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মো. মনজুর হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পের ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ। টানেলের যে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজগুলো হয়েছে, সেগুলোই এখন পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেটিকেই বলা হচ্ছে কমিশনিং ও প্রি-কমিশনিংয়ের কাজ। ইতিমধ্যেই কমিশনিং কাজের ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্প অফিস থেকে কাজ শেষ করার ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর আমরা টানেলটি খুলে দিতে পারব।’

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলে নিরাপদে গাড়ি চলাচলের জন্য টানেলের উভয় প্রান্তে স্ক্যানার বসানো হচ্ছে। এরই মধ্যে টানেলের ভেতর গাড়ি চলাচলে টোল চূড়ান্ত হয়েছে। সেতু বিভাগের ১২ ধরনের যানবাহনের জন্য টোল হার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়