ঢাকা, শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৭ ১৪২৭

শেখ হাসিনা : দেশ রূপান্তরের রোল মডেল

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:০৫, ৪ অক্টোবর ২০২০  

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলাদেশ নামের সাথে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র তকমা তামাদি হয়েছে বহুকাল। ‘উন্নয়নের নিরীক্ষা ক্ষেত্র’ অভিধাটিও আজ অচল। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে হতবুদ্ধি তাত্ত্বিকেরা এর একটা গালভরা নাম দিয়েছে ‘উন্নয়নের ধাঁধা’। প্রচলিত উন্নয়ন ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উন্নয়নের রহস্য তাত্ত্বিকদের এটা ব্যাখ্যাতীত হলেও এদেশের আম জনতার অজানা নয়। তারা জানে বাংলাদেশের উন্নয়নের কা-ারি কে, যাকে ভালোবেসে আস্থায় নিয়ে ভোট দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বারবার। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশের উন্নয়নের মহাসড়কে। সে পথ ধরে এগিয়ে চলা বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। আর বাংলাদেশের এ রূপান্তরের রূপকার শেখ হাসিনা বিশ্বসভায় আপন মহিমায় স্থান করে নেওয়া একজন সফল বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক নানান ইস্যুতে তার বিচক্ষণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব জাতি হিসেবে আমাদের গৌরবান্বিত করেছে। আশা জাগিয়েছে বাংলাদেশ একদিন তার হাত ধরে উন্নয়নের সকল ধাপ অতিক্রম করে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সাথে এক কাতারে শামিল হবে। সেটিও বেশি দূর নয়, এখন থেকে মাত্র দুই দশকের প্রান্তসীমায় বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী দেশ।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকদের জন্য শেখ হাসিনা হয়ে গেছেন একজন অনুকরণীয় নেতৃত্ব। তিনি দেশ-বিদেশের নেতাদের কাছে হয়ে গেছেন আস্থা ও ভরসাস্থল। তার একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও চিন্তাশীল নেতৃত্ব দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি, সমুদ্র বিজয়, নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশ বিজয়, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা সমুজ্জ্বল হয়েছে। এমনকি করোনা মোকাবিলায় শক্তিধর দেশগুলো হিমশিম খেলেও শক্ত হাতে শেখ হাসিনা অদৃশ্য ভাইরাস সামাল দিচ্ছেন। অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এখনো আক্রান্ত ও মৃতের হার কম। করোনায় বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেই রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এবং খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ।

বাংলা-নামে-দেশ

আবহমান কাল হতে সমৃদ্ধ বাংলার এক প্রতীকী দৃশ্যকল্প ছিল ‘সোনার বাংলা’। স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সেদেশের গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরু; যেখানে সন্তানেরা থাকে দুধে-ভাতে। এ স্বপ্ন নিয়ে বাঙালির কেটে গেছে কত হাজার বছর। বর্গীদের ঘুম পাড়ানি বাঙালির আজন্ম লালিত স্বপ্ন-ভালোবাসার সোনার বাংলা। বাঙালি প্রাণ দিয়েছে তবু স্বপ্ন দেখা ছাড়েনি। জুলুম-নির্যাতন সয়েছে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তি পেতে। কয়েক দশকের সংগ্রামের পথ পেরিয়ে অবশেষে সে প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে একাত্তরে। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ৯ মাসের এক মহান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালি ছিনিয়ে এনেছিল বাংলার স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশ বাংলাদেশ- যার স্থপতি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শেখ হাসিনা। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকারি ইন্টারমিডিয়েট ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি হয়েছিলেন। তিনি এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি ছিলেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একজন সদস্য এবং ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্র-জীবন থেকেই শেখ হাসিনা সকল গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

পাকিস্তানের ২৪ বছরের শোষণ এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের কালোনীতির ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, ফলে থেমে যায় বাংলাদেশের অগ্রগতি। শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা সে-সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছয় বছর ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডে থেকে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে অবশেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার পরপরই তিনি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তাকে বারবার কারাভোগ করতে হয়। তাকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়। শত বাধাবিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে যান। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ অর্জন করেছে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতা। ১৯৯১ সালের সংসদীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলসহ সকলকে সংগঠিত করেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি’র ভোটারবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে তিনি গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ তৎকালীন খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় শেখ হাসিনা সবসময়ই আপসহীন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১২ জুন ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্যসমূহ

পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলোর জনবিচ্ছিন্নতা, লুটপাট ও দর্শনবিহীন রাষ্ট্র পরিচালনা বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং ভিক্ষুক-দরিদ্র-হাড্ডিসার মানুষের দেশ হিসেবে। আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ ভাতা চালু, তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি, যেমনÑ আশ্রয়ণ প্রকল্প, ঘরে ফেরা, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মতো কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

এছাড়া আর্থ-সামাজিক খাতে দেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে। যেমনÑ ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এছাড়া, তিনি কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং ভূমিহীন, দুস্থ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি চালু করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : দুস্থ মহিলা ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। পূর্বের চেয়ে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতি অর্জিত হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই শাসনামলে।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তার দল আওয়ামী লীগ পরাজয়বরণ করে। এরপর শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে জটিলতা সৃষ্টি করলে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করে। প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে।

দিনবদলের সনদ

শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টো ‘দিনবদলের সনদ’ প্রদান করে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেন। তার ভাষায়, ‘প্রতিটি রাজনৈতিক দল যদি আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে কোনো কর্মসূচি বেশি ফলপ্রসূ, জনগণ তা বিচার করার সুযোগ পাবে।’ সে-চিন্তা থেকে প্রথাগত দফাওয়ারি রাজনৈতিক কর্মসূচির দীর্ঘ তালিকার পরিবর্তে শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের আলোকে প্রণীত রূপান্তরের রূপকল্প ২০২১ হলো বাঙালির অপূর্ণ উন্নয়ন ভাবনার স্বপ্নগাঁথা। যার অভীষ্ট ছিল স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের আর চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে রূপকল্প তৈরি করা প্রয়োজন। কেননা বাংলাদেশের মানুষকে একবার জাগাতে পারলে তারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে। তার অগাধ বিশ্বাস ছিল বাংলাদেশের মানুষের ওপর। বীর বাঙালি তার আস্থার চক্রান্ত কোনো কিছুই বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। তেমনি করে তরুণ প্রজন্মকে ব্যক্তিস্বার্থ ও ভোগবিলাস ত্যাগ করে দেশ ও দশের জন্য কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করতে দিনবদলের সনদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে রূপকল্প ২০২১। বাংলাদেশের প্রথম দূরদর্শী রূপকল্প দলিল।

রূপকল্প ২০২১ বাস্তবে রূপায়ণ

দিনবদলের এই সনদের প্রতি মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো গঠিত হয় শেখ হাসিনার সরকার। তার উন্নয়ন দর্শনের আলোকে এক বছরের মাথায় তৈরি করা হয় রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের পথনকশাÑ বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১। নির্ধারণ করা হয় বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অগ্রাধিকার। আর তা বাস্তবায়নে হাতে নেওয়া হয় ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনা গত এক দশকে অর্থনীতি ও সামাজিক মানদ-ে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ত্বরান্বিত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কারণে হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল।

২০০৯-১৩ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্যসমূহ

২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৯-১৩ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২৬০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন, ৫ কোটি মানুষকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণ, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক জলসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড এবং ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, বিনা জামানতে বর্গাচাষিদের ঋণ প্রদান, চিকিৎসাসেবার জন্য সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কম্যুনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৩৮.৪ থেকে ২০১৯-২০ সালে ২০.৫ শতাংশে হ্রাস, জাতিসংঘ কর্তৃক শেখ হাসিনার শান্তির মডেল গ্রহণ ইত্যাদি।

২০১৪-১৯ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য আরও সাফল্যসমূহ

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অর্জনের পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০১৪ সালের পর ২০১৯ সাল পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছে : বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণ, ভারতের পার্লামেন্ট কর্তৃক স্থল সীমানা চুক্তির অনুমোদন এবং দুই দেশ কর্তৃক অনুসমর্থন, (এর ফলে দুদেশের মধ্যে ৬৮ বছরের সীমানা বিরোধের অবসান হয়েছে), মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮৪ মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, ৩৯ বিলিয়ন ডলারের ওপর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, পদ্মাসেতুর বাস্তবায়ন শুরু ইত্যাদি।

এমডিজি অর্জন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর এবং তা অর্জনে আন্তরিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, তার সফল বাস্তবায়ন ও নিবিড় পরিবীক্ষণের ফলে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই এমডিজির অধিকাংশ অভীষ্ট সাফল্যজনকভাবে অর্জন করেছে। বিশেষত, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন, জেন্ডার সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের অগ্রপথিক। এর স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বের অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মানজনক পদক এবং পুরস্কারে ভূষিত করেছে। তন্মধ্যে এমডিজি-১ অর্জনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক `Diploma Award` এমডিজি-৪ অর্জনে জাতিসংঘ কর্তৃক` UN MDG Awards 2010′, এমডিজি-৫ এর সাফল্য ‘South-South Award’ অন্যতম। আরও সম্মাননা প্রাপ্তির উল্লেখ রয়েছে এই নিবন্ধের শেষ অংশে।

বর্তমান মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্যসমূহ

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ৭ জানুয়ারি ২০১৯ শেখ হাসিনা টানা তৃতীয় মেয়াদে এবং চতুর্থবারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ক্ষুদ্র আয়তনের উন্নয়নশীল একটি দেশ হয়েও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সারাবিশ্বের নিকট প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে তার ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে আজকের অবস্থানে আসতে হাজারো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত, প্রায় সর্বক্ষেত্রে অবকাঠামোবিহীন বাংলাদেশের ৪৯ বছরের ইতিহাসে অর্জনের পরিসংখ্যান বিশাল। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৮টি লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষা, শিশুমৃত্যু হার কমানো এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের করা মন্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেবার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের।’ বিশেষত শিক্ষা সুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হার ও জন্ম হার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অন্যতম।

টেকসই উন্নয়নে এসডিজি

প্রধানমন্ত্রীর নীতি-নির্দেশনায় সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়-বিভাগভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, অর্থায়ন কৌশল নির্ধারণ, তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি নিরূপণ, এসডিজি স্থানীয়করণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নিবিড় পরিবীক্ষণের ফলে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অগ্রসরমান একটি দেশ। গত ২২ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের একনেক সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসডিজি অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০২০-এর মোড়ক উন্মোচন করেন। প্রতিবেদন অনুসারে বেশ কিছু সূচকের ক্ষেত্রে ২০২০ সালের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সূচকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি অর্জনের পথেই রয়েছে।

রূপান্তরের সাফল্য গাঁথা

সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়ন আকাক্সক্ষাকে কটাক্ষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ শাসনে আজ দিনবদল হয়েছে। তারই স্বীকৃতি দিয়ে আরেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে এগিয়ে যাচ্ছে।’ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মতে, ‘শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে আছে।’ ব্রিটিশ প্রধানন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং নারী-পুরুষের সামাজিক সমতা অর্জনের জন্য বিশ্বের বুকে অনুকরণীয়।’ যার রূপকার বাংলার অবিসংবাদী নেতা শেখ হাসিনা।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে

১ জুলাই ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায়। ১৭ মার্চ ২০১৮ জাতির পিতার ৯৮তম জন্মদিনে বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হতে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার প্রাথমিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এ ৩টি সূচকের যে কোনো দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ ৩টি সূচকের মানদণ্ডেই উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসক)-এর মানদ- অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশ হতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৮৪ মার্কিন ডলার। ইকোসকের মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশ হতে ৬৪ পয়েন্টের প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের আছে ৭২ পয়েন্ট। অর্থনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে পয়েন্ট ৩৬-এর নিচে হলে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন করে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২৫.২। সরকারের জনকল্যাণমূলক কৌশলই বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান সময়ে বাংলাদেশকে এই প্রশংসা অর্জনে সহায়তা করেছে। দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন ও স্বীকৃতি এটি। জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি বড় অর্জন।

আয় ও দারিদ্র্যসীমা

বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে প্রায় শূন্য হাতে। প্রথম দুই দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের আটকে ছিল নিম্ন আয়ের ফাঁদে। এ সময়ের সামরিক সরকারের পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে পিছে টেনে ধরা। তাদের অর্জনও ছিল আরও কম। ব্যতিক্রম কেবল বঙ্গবন্ধুর আমলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে গৃহীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, যা ছিল পরবর্তী দু-দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর ১৯৭৫ সালেই অর্জিত হয়েছিল ৭ শতাংশ। বঙ্গবন্ধুর অকাল প্রয়াণের পর সেই মাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও তিন দশক। এরপর অচল প্রবৃদ্ধির চাকা সচল হয় শেখ হাসিনার ১৯৯৭-২০০২ সালের প্রথম মেয়াদে গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয় ৫.১ শতাংশ, যা পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ। শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর ত্বরান্বিত এ প্রবৃদ্ধির চাকা আর থামেনি। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে অর্জিত গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৩ শতাংশ এবং সপ্তম পরিকল্পনা মেয়াদে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৬ শতাংশ। তন্মধ্যে কেবল ২০১৮-১৯ সালে এ হার ছিল ৮.১৫ শতাংশ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। করোনাকালে বিশ্বের দেশে দেশে অর্থনীতির ব্যাপক সংকোচনের মুখে বাংলাদেশের অর্জিত প্রবৃদ্ধি ৫.২ শতাংশ ছিল সারাবিশ্বে সমীহ জাগানিয়া।
প্রবৃদ্ধির উচ্চতর সোপানে অধিষ্ঠিত বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসনে অগ্রগতিও বিশ্বে প্রশংসনীয়। বিগত দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে দ্বিগুণ। বিগত এক দশকে অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বিকাশের সাথে সংগতি রেখে উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ অর্থনৈতিক নীতির কারণে দারিদ্র্য নিরসন এতটাই বেগবান হয়েছে যে, ২০১৯ সালের প্রাক্কলন মোতাবেক দারিদ্র্য নেমে এসেছে ২০.৫ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার এখন মাত্র ১০.৫ শতাংশ। দারিদ্র্য নিরসনে এ সাফল্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য হটিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে এদেশ থেকে দারিদ্র্যকে চিরতরে নির্মূলের স্বপ্ন দেখছে।

মানব উন্নয়ন

শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। তিনি তার দল ও দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যৎমুখী একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো শিক্ষিত জনশক্তি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (১৯৯৪) বলেন, ‘একটি জাতিকে গড়ে তোলার প্রথম সোপান হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। আমরা যদি বাংলাদেশের চির অবহেলিত দারিদ্র্যপীড়িত অসহায় জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি ও সার্বিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করি, তাহলে শিক্ষাই হচ্ছে তার পূর্বশর্ত।’ জাতিসংঘও এখন এসডিজিতে ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা’ ধারণাটি প্রচলন করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা-ব্যবস্থার দুর্বল কাঠামো এবং কারিগরি শিক্ষার অপ্রতুলতাকে শিক্ষার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে শিক্ষা-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের মান ২০০০ সালে ০.৪৫ থেকে ২০১৭ সালে ০.৬১-এ উন্নীত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় নীট ভর্তির হার ২০০৫ সালে ৮৭.২ ঝরে পড়া ছাত্র-ছাত্রীর হার ২০০৯ সালে ৪৫.১ শতাংশ থেকে কমে ২০১৮ সালে ১৮.৬ শতাংশ হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের উপবৃত্তি চালু করার ফলে মেয়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশেরও কম ব্যয় করে বাংলাদেশের এ অর্জন বিশ্বে অনন্য। শিক্ষা খাতের অর্জন আরও বেগবান ও টেকসই করতে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ খাতের বিনিয়োগ দ্বিগুণ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অর্জন উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুকরণীয়। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি উদ্ভাবনী কার্যক্রম গ্রহণের ফলে ধারাবাহিকভাবে সন্তান প্রসবকালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতির হারে চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে। মাতৃমৃত্যুর হার ২০০৫ সালে ৩৪৮ থেকে কমে পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার ২০০৫ সালে ৬৮ থেকে কমে ২০১৯ সালে ২৮ এবং প্রসবকালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি ২০০৪ সালে ১৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৫৯ শতাংশ হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় সাফল্য

১৮ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আজ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সুযোগ-সুবিধা। স্থাপন করা হয়েছে হৃদরোগ, কিডনি, ক্যানসার, নিউরো, চক্ষু, বার্ন, নাক-কান-গলাসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। অব্যাহত নার্সের চাহিদা মেটাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নার্সিং ইনস্টিটিউট। বিগত ১১ বছরে ২০ হাজার ১০২ জন নতুন চিকিৎসক এবং ২১ হাজার ৬৯৭ জন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের কাজ চলছে।

শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম আদর্শ দেশ হিসেবে তার স্থান করে নিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতকে যুগোপযোগী করতে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালা-২০১১’। তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গড়ে তোলা হয়েছে ১২ হাজার ৭৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক। ৩১২টি উপজেলা হাসপাতালকে উন্নীত করা হয়েছে ৫০ শয্যায়। মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোতে ২ হাজার শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হার এবং জন্ম হার হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ১৯৯০ সালে নবজাতক মৃত্যুর হার ১৪৯ থেকে নেমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৫৩-তে। স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবার লক্ষ্যকে সামনে রেখে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ১২টি মেডিকেল কলেজ, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৪৭ হাজারেরও বেশি জনশক্তি।

টেকসই কৃষি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শেখ হাসিনার উন্নয়ন-ভাবনায় সর্বদাই গ্রামের কৃষক আর কৃষি প্রাধান্য হাজার বছরের ইতিহাসের ধারায় আমাদের গ্রামগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সব ওলটপালট হয়ে যায়। অনেকেই বিদেশে চলে যায়। কৃষকের ছেলে কৃষিকাজে অনীহা প্রকাশ করে। এদেশের মাটি এত উর্বরÑ একটি বীজ ফেললেই ফল হয়। অভাব শুধু উদ্যোগ ও আগ্রহ সৃষ্টির। এ পরিস্থিতি বদলাতে ‘গ্রামকেই প্রাধান্য দিতে হবে… গ্রামকে কেন্দ্র করে গাছের যত্ন কীভাবে করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে তা কাজে লাগাতে হবে।’ রূপকল্প ২০২১-এ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য ঘাটতি দূর করা এবং দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছিল, তা সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে এরই মধ্যে অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ইন্দোনেশিয়াকে হটিয়ে বিশ্বে চাল এবং সর্বোপরি কৃষি খাতে বর্ধিত বিনিয়োগের ফসল। তার আমলেই অর্জিত হয়েছে প্রধান খাদ্যশস্য ধানের সর্বোচ্চ উৎপাদন ৩৮ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন টন (জুন ২০২০)।

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ

বিশ্ব বণিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ একটি উদীয়মান প্রথম প্রজন্মের শিল্পোদ্যোক্তা জাতি। বাংলাদেশ বর্তমান বাজারের প্রতিষ্ঠিত কুশীলবদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার সক্ষমতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি সাফল্য এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে রপ্তানির গতি শ্লথ হয়ে এলেও তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিগত কয়েক দশকে অব্যাহতভাবে সরকারের নীতি সহায়তা কাজে লাগিয়ে বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। ভিয়েতনামকে সরিয়ে এখন চীনের পরেই বাংলাদেশের স্থান। রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে বাণিজ্যসেবা সহজীকরণসহ পোশাক-বহির্ভূত অন্যান্য খাতে তৈরি পোশাক খাতের মতো একই ধরনের সুবিধা প্রদানের কৌশল গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বৈদেশিক কর্মসংস্থান। সরকারের কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও বিভিন্ন প্রবাসী আয় রেমিট্যান্সও বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৫-০৬ সালে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার হতে ২০১৭-১৮ সালে ১৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২০০৫-০৬ সালে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২০ সালে ৩৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ

গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে গ্রহণ করা হয় ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ ও ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্প। রূপকল্প ২০২১-এর একটি প্রধান মাইলস্টোন ছিল ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনসংখ্যার অনুপাত ২০০৫ সালে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস পানি ও সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসে ১.২ শতাংশ। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত গ্রিড বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে থাকা ৫১ হাজার ৫৬৪টি ঘরে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।

ঢাকায় মেট্রোরেল

বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণের সংযোগ সেতু পদ্মা বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতীক। প্রমত্ত পদ্মার বুকে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে কতই না নাটকীয়তা। একটি ধারণাগত দুর্নীতির অজুহাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে নজিরবিহীনভাবে ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয় বিশ্বব্যাংক। এ নিয়ে বিশ্বব্যাংক পানি ঘোলা করলে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃঢ়তার কথা। এ যেন শাপে বর পাওয়ার মতো বাংলাদেশের সাথে খুলে যাবে অর্থনীতির নতুন দুয়ার। এছাড়া ঢাকা শহরে আধুনিক ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্যে যানজট নিরসনে জাপানের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প বাংলাদেশের উন্নয়নে আরেক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে : উন্নয়নের ছোঁয়া আজ সর্বত্র

রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার কৃতিত্বের স্বাক্ষর বিরাজমান সর্বত্র- জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যেমন সফল তেমনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে তার পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, যা বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ে ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা স্বীকৃতি পায়। ১৯৮২ সাল থেকে অমীমাংসিত এ বিষয়টি ফয়সালার ফলে ভুক্তভোগী জনগণের দুর্ভোগ লাঘব হয়। ২০১৫ সালে সমুদ্র বিজয় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত করে। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের সমুদ্রসীমা নিয়ে আইনি বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের এলাকাভুক্ত ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার ওপর স্বত্বাধিকার লাভ করে। সমুদ্রের নীল জলরাশি ও তার সম্পদ আহরণে এই উন্মুক্ত অধিকারের সুযোগ কাজে লাগাতে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এ সুনীল অর্থনীতির কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১৫ সালে বিশ্বের অন্যতম জটিল ও দীর্ঘায়িত সীমান্ত সমস্যার সফল সমাপ্তি হয়। ভারতের সাথে স্থল সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় করে বাংলাদেশ পায় ভারতের ১১১টি ছিটমহল। এ চুক্তির ফলে নতুন আশা নিয়ে জীবন শুরু করে। মহাকাশে বাংলাদেশের পতাকাখচিত পদচিহ্ন একে দেওয়া বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট বাংলাদেশের রূপান্তরের আরেক মাইলফলক, যা ২০১৮ সালে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব

রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে আরেকটি লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর। এর প্রধান উদ্দেশ্য পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে সরকারের অনলাইন সেবাসমূহ জনগণের নিকট পৌঁছে গেছে। সকল অনলাইন ব্যাংকিং প্রক্রিয়া চালু করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

নারী ও শিশু উন্নয়নে সাফল্য

নারীর সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১’। নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি কার্যক্রম। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে গৃহীত হয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। প্রযুক্তি জগতে নারীদের প্রবেশকে সহজ করতে ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রের মতো ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যসেবায় উদ্যোক্তা হিসেবে একজন পুরুষের পাশাপাশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন নারী উদ্যোক্তাকেও। ‘জাতীয় শিশুনীতি-২০১১’ প্রণয়নের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হয়েছে শিশুদের সার্বিক অধিকারকে। দেশের ৪০টি জেলার সদর হাসপাতাল এবং ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থাপন করা হয়েছে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল। দুস্থ, এতিম, অসহায় পথ-শিশুদের সার্বিক বিকাশের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের নারী ও শিশুর উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভূষিত করা হয়েছে জাতিসংঘের সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ডে।

নারীর ক্ষমতায়নে অর্জন

নারী বঞ্চনার তিক্ত অতীত পেরিয়ে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে অনেকদূর এগিয়েছে। পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ দেশ। আর এই শিল্পের সিংহভাগ কর্মী হচ্ছে নারী। ক্ষুদ্র ঋণ বাংলাদেশে গ্রামীণ উন্নয়নে ও নারীর ক্ষমতায়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছে। আর ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে ৮০ শতাংশের ওপর নারী। বাংলাদেশ সরকার নানাভাবে নারী উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছে।

বাজেটের আকার বৃদ্ধি

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশের প্রমাণ মেলে তার বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনায়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের শেষ বছরে বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৯.৩২ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকায়। ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। বাজেটের ৯০ শতাংশই এখন বাস্তবায়িত হয় নিজস্ব অর্থায়নে।

সন্ত্রাস এবং জঙ্গি দমনে সাফল্য

সন্ত্রাস দমনে সরকার সাফল্য অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ উদ্যোগের ফলে দেশে নাশকতার হার অনেক কমে এসেছে। দেশের মানুষ এখন শান্তিতে বসবাস করছে। এছাড়া জঙ্গি দমনেও সরকার ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। জঙ্গিরা হলি আর্টিজান হত্যাকা-সহ বেশ কয়েকটি পৈশাচিক ঘটনাও ঘটিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার শক্ত নেতৃত্বে পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনীসহ সকল বাহিনীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জঙ্গিদের মেরুদ- ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে গভীর সমুদ্রের তলদেশে অপটিক্যাল ফাইবার নির্মাণ, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট স্থাপন, মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু, উপজেলা শহরে ব্যাংকের এটিএম বুথ নির্মাণসহ সহজলভ্য ইন্টারনেট সেবা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। দেশের তৃণমূল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে দেশের প্রায় সকল ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এসব পোর্টাল রয়েছে। দেশের সবক’টি উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেটের আওতায়। টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫ কোটিরও বেশি মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। দেশের ৩ হাজার ৫০০-র বেশি ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ফোর-জি প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্কের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার পর এখন ফাইভ-জি প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে চালু করা হয়েছে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পাদন করার বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এখন সর্বত্রই পণ্য কেনাবেচা হয় অনলাইনে। করোনায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা হয়েছে। শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদার চেয়েও এখন বেশি বিদ্যুৎ দেশে উৎপাদন হচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কুঁড়েঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি। গ্রামাঞ্চলের মানুষও এখন ইন্টারনেট এবং ডিশলাইনের সেবা পাচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কের জন্য মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষপণ করা হয়েছে।

কৃষিতে কৃতিত্ব এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন

শেখ হাসিনার সরকার শিল্পায়নের পাশাপাশি কৃষিতে সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্যশস্য, মাছ ও মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। চাল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান চতুর্থ এবং মাছ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। কৃষি উপকরণের দাম কয়েক দফা হ্রাস করা হয়েছে। কৃষিতে আধুনিকায়ন এবং নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করায় ধান উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে উঠতে যাচ্ছে। কৃষি খাতে অভূতপূর্ব কিছু সাফল্যের জন্য বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ বারবার আলোচিত হয়েছে। প্রায় ১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন। ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি সারের দাম কৃষক পর্যায়ে কমানো হয়েছে। ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে সাফল্য

দেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুৎ গ্রাহক সংখ্যা ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সাথে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৫১০ কিলোওয়াট থেকে ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৭৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়েছে। টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য রামপাল, মাতারবাড়ী, পায়রা ও মহেশখালীতে মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। পাবনার রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। ২০২১ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

শিল্প খাতে সাফল্য

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পাশাপাশি প্রসার ঘটেছে আবাসন, জাহাজ, ওষুধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য শিল্পের। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় যোগ হয়েছে জাহাজ, ওষুধ এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী। বাংলাদেশের আইটি শিল্প বহির্বিশ্বে অভূতপূর্ব সুনাম কুড়িয়েছে। সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে রপ্তানি আয় এদেশে পূর্বের তুলনায় বহুগুণে বেড়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশের অর্জন

নিরাপত্তা খাতে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৭৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, মোট বাজেটের ১৬.৮৩ শতাংশ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ কোটির বেশি মানুষ উপকৃত হচ্ছে। কেউ যাতে গৃহহীন না থাকে সে-জন্য আমরা একাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি। জমি আছে ঘর নেই এমন পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভূমিহীন, নদীভাঙনে উদ্বাস্তুদের জন্যও ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি বিস্তৃত করতে বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও দুস্থ মহিলা ভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃকালীন ভাতাসহ ভাতার হার ও আওতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। করোনাজনিত আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করা এবং গ্রামে বসবাসরত দরিদ্র, দুস্থ ও অসহায় মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রমে জন্য ১০০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্রদানের ঘোষণা করা হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় অর্জন

ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে ৫৫টি জেলায় বিদ্যমান মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান কম্পিউটারাইজেশনের কাজ সম্পন্ন করার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। ভূমির পরিকল্পিত ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে মোট ২১টি জেলার ১৫২টি উপজেলায় ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ম্যাপ সম্বলিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রণীত হয়েছে ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন, ২০১২-এর খসড়া’।

জলবায়ু মোকাবিলায় সাফল্য

উন্নত দেশগুলো মূলত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি কমাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এ সকল আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। বাংলাদেশেও অন্যান্য দেশের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়ন ও ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বিশেষ নজর রেখে প্রকল্প গ্রহণ ও কর্মকা- বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্প কার্বন নিঃসরণ কৌশল অনুসরণ করছে। এছাড়া সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেও কার্বন নির্গমন হ্রাসের বিভিন্ন ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় গতিশীলতা

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় উঠে আসে জন্মের ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কীভাবে বাংলাদেশ দ্রুতগতিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মতো সফলতা দেখিয়েছে। উঠে আসে জাতির পিতা কীভাবে সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য একতাবদ্ধ করেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে কীভাবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক। পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি/অর্জন

শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন ডিগ্রি এবং পুরস্কার প্রদান করে। তিনি বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডিগ্রি এবং সম্মাননা পেয়েছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি যা পেয়েছেন, বাংলাদেশ তো নয়ই; দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো নেতার পক্ষে তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের কারণেও বিভিন্ন স্বীকৃতি অর্জন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি, ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কটল্যান্ডের অ্যাবারটে বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রাসেলসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া ফ্রান্সের ডাওফি বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক তাকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রদান করে।

সামাজিক কর্মকাণ্ড, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা সম্মানিত করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সুদীর্ঘ ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো তাকে ‘হুপে-বোয়ানি’ (Houphouet-Boigny) শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রানডলপ ম্যাকন উইমেন্স কলেজ ২০০০ সালের ৯ এপ্রিল মর্যাদাসূচক ‘Pearl S. Buck -99’ পুরস্কারে ভূষিত করে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শেখ হাসিনাকে সম্মানজনক ‘সেরেস’ (CERES) মেডেল প্রদান করে। সর্বভারতীয় শান্তিসংঘ শেখ হাসিনাকে ১৯৯৮ সালে ‘মাদার টেরেসা’ পদক প্রদান করে। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক রোটারি ফাউন্ডেশন তাকে Paul Haris ফেলোশিপ প্রদান করে। পশ্চিমবঙ্গ সর্বভারতীয় কংগ্রেস ১৯৯৭ সালে তাকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু স্মৃতি পদক প্রদান করে। আন্তর্জাতিক লায়ন্স ক্লাব কর্তৃক ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে তিনি ‘Medal of Distinction’ পদক ও ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে ‘Head of State’ পদক লাভ করেন। এছাড়া তিনি ব্রিটেনের গ্লোবাল ডাইভারসিটি পুরস্কার এবং দুবার সাউথ-সাউথ পুরস্কারে ভূষিত হন।

২০১৪ সালে ইউনেস্কো তাকে ‘শান্তিবৃক্ষ’ এবং ২০১৫ সালে উইমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে অব্যাহত সমর্থন, খাদ্য উৎপাদনে সয়ম্ভরতা অর্জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদানের জন্য আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালে তাকে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করে। এছাড়া, টেকসই ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য International Telecommunication Union (ITU) শেখ হাসিনাকে ICTs in Sustainable Development Award-2015-২০১৫ প্রদান করে। 

শেখ হাসিনা ‘জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর সভাপতি। তিনি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতিতে বিশ্বাসী এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। শেখ হাসিনা ৩০ বছরের গঙ্গা পানি চুক্তি, পার্বত্য শান্তিচুক্তি, জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্বীকৃতি, মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা বিজয়, ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহল সংকটের সমাধান করেছেন। তিনি মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যার পুরস্কার হিসেবে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ সম্মান অর্জন করেছেন।
এই সাফল্যের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা শেখ হাসিনাকে নানাভাবে সম্মানিত করেছে। তিনি জাতিসংঘের ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ পুরস্কার’, ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ পুরস্কার, আবহাওয়া পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ’ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’ পেয়েছেন।

এছাড়াও রাজনীতিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনে ‘পান ওম্যান ইন পার্লামেন্ট (ডব্লিউআইপি) গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড’, নারী ও শিশু শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য ‘শান্তি বৃক্ষ পদক’, ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’, জাতিসংঘের ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অ্যাওয়ার্ড’, ‘ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড’, ‘কালচারাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড’, ‘গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড’, ‘ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পদক’, ‘ডক্টরস অব হিউম্যান লেটার্স’, ‘নেতাজি মেমোরিয়াল’ পদকসহ অর্ধশতাধিক পদক পেয়েছেন।

সংবেদনশীল ও মানবতাবাদী লেখিকা

শেখ হাসিনা বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : শেখ মুজিব আমার পিতা, ওরা টোকাই কেন?, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র্য বিমোচন, কিছু ভাবনা, আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম, আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, সাদা কালো, সবুজ মাঠ পেরিয়ে, Miles to Go, The Quest for Vision-2021 (two volumes)।

রূপকল্প ২০৪১ ও অব্যাহত অগ্রযাত্রা

রূপকল্প ২০২১-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-এর স্বপ্নের উন্নয়নের পথে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে রূপকল্প ২০৪১ গ্রহণ করে ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান এবং উচ্চ-মধ্য আয়ের সোপানে উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের অবলুপ্তিসহ বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সমাজ ও অর্থনীতিতে ভবিষ্যৎ রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ মানব পুঁজিতে রূপান্তরপূর্বক এর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে এই অর্জন সম্ভব। বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ পালন করছে। এ এক অনন্য অনুকূল সময়, যখন অতীত সাফল্য ও অর্জন নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি আগামী দুই দশকের সম্ভাব্য সমস্যা সমাধান ও সম্ভাবনার সদ্ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণেরও সময়। উন্নত সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ার পথে আমাদের সামনে পর্বতসম সমস্যা থাকলেও তা অলঙ্ঘনীয় নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন সাফল্য প্রমাণ করেছে যে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সঠিক পরিকল্পনা কৌশল ও নিবেদিত প্রচেষ্টায় দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত, বলিষ্ঠ ও অবিচল নীতি-নেতৃত্বে রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। শেখ হাসিনা তার উন্নয়নকামী জীবন দর্শন ও কর্মনিষ্ঠায় প্রমাণ করেছেন তিনি উন্নয়ন রূপান্তরের যথার্থই নজিরবিহীন রোল মডেল।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

সর্বশেষ
জনপ্রিয়